টিকাদান এবং টিকা

টিকাদান এবং টিকা

  • টিকাদান
  • টিকা
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (অনাক্রম্যতা)
  • টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া (অ্যাডভার্স ইভেন্টস ফলোইং ইম্যুনাইজেসন)   
  • কোভিড-১৯ টিকা
  • সর্বজনীন টিকাকরণ কর্মসূচি (ইউআইপি)
  • মিশন ইন্দ্রধনুষ
  • ইন্টেন্সিফায়েড মিশন ইন্দ্রধনুষ

টিকাদান

টিকাদান শব্দটির সঙ্গে দুটি অর্থ যুক্ত রয়েছে, টিকা গ্রহণ এবং যে রোগের বিরুদ্ধে টিকাগ্রহণ করা হচ্ছে সেটির প্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে ওঠা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল টিকাদান। টিকাদানের ফলে বর্তমানে প্রতি বছর ভ্যাকসিন দ্বারা
প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে ২০-৩০ লক্ষ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

টিকাকরণ কি?

টিকাকরণ এবং টিকাদান উভয় পদই প্রায়শই পরস্পরের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। শরীরে টিকা দেওয়াকে টিকাকরণ হিসাবে অভিহিত করা হয়। টিকাগুলি শুধুমাত্র সংক্রামক রোগগুলির সঙ্গে জড়িত অসুস্থতা এবং মৃত্যুকে প্রতিরোধ করে তাই নয়, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিস্তার সীমাবদ্ধ করতে এবং প্রতিরোধযোগ্য অসুখ এবং মৃত্যু হ্রাস করতেও সাহায্য করে।

টিকাকরণ কেন প্রয়োজনীয়?

সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার আগেই ক্ষতিকারক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার সহজ, নিরাপদ এবং কার্যকর উপায় হল টিকাকরণ। পোলিও, ডিপথেরিয়া, পারটুসিস, টিটেনাস এবং হামের মতো প্রায় ২০টি রোগ টিকাগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যখন আমরা টিকা গ্রহণ করি, আমরা কেবল নিজেরাই নয়, আমাদের চারপাশের মানুষদেরও রক্ষা করি। বেশ কিছু ব্যক্তিদের কিছু নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে যারা টিকা গ্রহণ করে তাঁরা রোগের বিস্তার প্রতিরোধে সহায়তা করে।

টিকা

টিকাগুলি জৈব প্রস্তুতি, আমাদের শরীর যখন কোনও রোগের সংস্পর্শে আসে তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে সংক্রামক এজেন্টের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, তেমনি টিকাদানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর হয়। ভবিষ্যতে যদি আমরা এই জাতীয় জীব/জীবাণুর সংস্পর্শে আসি তবে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করতে শুরু করে এবং দ্রুত এটি ধ্বংস করতে পারে।

টিকার কারণে রোগ হয় না, বরং এটি শরীরের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উদ্দীপ্ত করতে সাহায্য করে। টিকার জন্য রোগ হতে পারে না কারণ এগুলিতে কেবল কোনও নির্দিষ্ট জীবসত্তার (অ্যান্টিজেন) নিষ্ক্রিয় বা মৃত অংশ থাকে যা দেহের অভ্যন্তরে অনাক্রম্যতা সৃষ্টি করে।

দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবডি তৈরি এবং স্মৃতি কোষগুলির বিকাশের জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস বাদে কিছু টিকার একাধিক ডোজ দিতে হয়।

বিভিন্ন পথের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হয়। বেশিরভাগ ভ্যাকসিনগুলি ইনজেকশন দিয়ে দেওয়া হয় তবে কিছু মুখে দেওয়া বা নাকে ছিটিয়ে দেওয়া হয়।

টিকাগুলি কীভাবে কাজ করে?

রোগের সংস্পর্শে এলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে, একইভাবে টিকাগুলি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়। সুতরাং যখন ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, তখন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিম্নলিখিত উপায়ে প্রতিক্রিয়া জানায়:

  • এটি আক্রমণকারী জীবাণুকে শনাক্ত করে, যেমন ভ্যাকসিনে উপস্থিত ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়া (অ্যান্টিজেন),
  • জীবাণুর সাথে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে,
  • জীবাণুর বিষয়ে স্মৃতি থাকে এবং
  • ভবিষ্যতে, কোনও ব্যক্তি যদি এই জাতীয় জীব/জীবাণুতে আক্রান্ত হন, তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হয় এবং দ্রুত জীবাণু ধ্বংস করতে পারে।

 (অ্যান্টিজেনগুলি হল ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়া বা তাদের টক্সিনের মতো জীবাণুর উপাদান/বিচ্ছিন্ন অংশ)।

(অ্যান্টিবডিগুলি হল টক্সিন বা রোগ বহনকারী জীবাণুকে অকেজো বা ধ্বংস করতে শরীর দ্বারা উৎপাদিত প্রোটিন। নির্দিষ্ট রোগগুলির জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি থাকে।)

টিকা কয়প্রকার?

টিকা বিভিন্ন ধরণের হয়-   

হোল প্যাথোজেন ভ্যাকসিন- এই টিকাগুলিতে এমন সমস্ত রোগজীবাণু থাকে যা মৃত বা দুর্বল হয়ে গিয়েছে যাতে তারা রোগ সৃষ্টি করতে না পারে কিন্তু প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ‘হোল প্যাথোজেন ভ্যাকসিন’ দুই প্রকারের হতে পারে-

১) নিষ্ক্রিয় টিকাগুলিতে মৃত প্যাথোজেন (রাসায়নিক, তাপ বা বিকিরণ ব্যবহার করে) থাকে। এর কয়েকটি উদাহরণ হল-

  • হেপাটাইটিস-এ
  • জলাতঙ্ক
  • নিষ্ক্রিয় পোলিও ভাইরাস

২) লাইভ-অ্যাটিনুয়েটেড ভ্যাকসিনগুলি জীবাণুর দুর্বল (বা ক্ষুদ্র) রূপ ধারণ করে যা একটি রোগের কারণ হতে পারে। যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ তাঁদের পক্ষে এই জাতীয় ভ্যাকসিনগুলি উপযুক্ত নাও হতে পারে। নীচে কয়েকটি লাইভ অ্যাটিনুয়েটেড ভ্যাকসিনের উদাহরণ দেওয়া হল-

  • বিসিজি (যক্ষ্মা)
  • ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (ওপিভি)
  • হাম, হাম মাম্পস রুবেলা (এমএমআর)
  • রোটাভাইরাস
  • পীত জ্বর।

সাবইউনিট ভ্যাকসিন: পুরো প্যাথোজেনের পরিবর্তে, সাবইউনিট ভ্যাকসিনগুলিতে একটি ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়ার কেবলমাত্র নির্দিষ্ট উপাদান বা অংশ (সাবইউনিটস) অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপ্ত করে। বিভিন্ন ধরণের সাবইউনিট ভ্যাকসিন রয়েছে যেমন প্রোটিন সাবইউনিট ভ্যাকসিন, পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন এবং কনজুগেট সাবইউনিট ভ্যাকসিন। কয়েকটি সাবইউনিট ভ্যাকসিন হল-

  • হিমোফিলিয়াস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (এইচআইবি)
  • নিউমোকক্কাল (পিসিভি)
  • হেপাটাইটিস বি (এইচপিবি)
  • হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস।

টক্সোয়েড ভ্যাকসিন- এই টিকাগুলিতে জীবাণু দ্বারা তৈরি একটি টক্সিন (ক্ষতিকারক উপাদান) থাকে। এগুলি সম্পূর্ণ জীবাণুর পরিবর্তে জীবাণুর ক্ষতিকারক অংশের বিরুদ্ধে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে । টক্সোয়েড ভ্যাকসিনগুলিতে থাকা অ্যান্টিজেনগুলি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় টক্সিন হয়, যা টক্সোয়েড হিসাবে পরিচিত। কয়েকটি টক্সোয়েড টিকার উদাহরণ হল-

  • ডিপথেরিয়া টক্সোয়েড
  • টিটেনাস টক্সোয়েড

নিউক্লিক অ্যাসিড ভ্যাকসিন: নিউক্লিক অ্যাসিড ভ্যাকসিনগুলিতে রোগ প্রতিরোধকারী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ামের (জীবাণু) জিনগত উপাদানগুলি ব্যবহার করা হয়, যা এর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা উদ্দীপ্ত করে। জেনেটিক উপাদানগুলি ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) বা আরএনএ (রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) হতে পারে। এটি তুলনামূলকভাবে নতুন প্রযুক্তি যদিও বেশিরভাগ ‘ডিএনএ’ ভ্যাকসিনগুলি বিভিন্ন প্রাণীদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত যেমন, ‘ওয়েস্ট নীল ভাইরাসে’র বিরুদ্ধে ঘোড়ার ভ্যাকসিন।

ভাইরাল ভেক্টর-বেসড্‌ ভ্যাকসিনগুলি: কিছু ভ্যাকসিন ভেক্টর বা বাহক হিসাবে কোনও ক্ষতি করে না এমন ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়াম ব্যবহার করে কোষগুলিতে জেনেটিক উপাদানের প্রবর্তন করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা গড়ে তোলে। ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিনের উদাহরণ হল ইবোলার বিরুদ্ধে ‘আরভিএসভি-ঝেবোভ’(rVSV-ZEBOV) টিকা। ভাইরাল ভেক্টর-বেসড্‌ ভ্যাকসিন দুই প্রকারের হয়-

  • নন-রেপ্লিকেটিং ভেক্টর ভ্যাকসিন (কোষের মধ্যে প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারেনা)
  • রেপ্লিকেটিং ভেক্টর ভ্যাকসিন (কোষের মধ্যে প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে)

অনাক্রম্যতা

অনাক্রম্যতা বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করার জন্য শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোষগুলি ক্ষতিকারক জীব/প্যাথোজেনের সংস্পর্শে এলে এটি কাজ করতে শুরু করে যেমন ভাইরাস বা জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং সফলভাবে লড়াই করে।

(একটি প্যাথোজেন বলতে বোঝায় একটি ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী বা ছত্রাক যা শরীরের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম)

অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সহজাত বা অর্জিত হতে পারে।

সহজাত অনাক্রম্যতা: যে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা জন্মগ্রহণ করি যেমন সিলিয়া, ত্বক, গলার শ্লেষ্মা ঝিল্লি এবং অন্ত্রে সহজাত অনাক্রম্যতা হিসাবে কাজ করে। যাইহোক, এই প্রতিক্রিয়াগুলি কোনও নির্দিষ্ট প্যাথোজেনিক উপাদানের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত থাকে না এবং সহজাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্মৃতি বজায় রাখতে পারে না।

অভিযোজিত বা অর্জিত অনাক্রম্যতা: প্যাথোজেন যখন সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেদ করতে সক্ষম হয় তখন অভিযোজিত বা অর্জিত অনাক্রম্যতা কাজ করতে শুরু করে। এটি প্রকৃত রোগের সংক্রমণের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করতে পারে যাকে স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বলে। আবার রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেনের একটি মৃত বা দুর্বল রূপের প্রবর্তনের মাধ্যমে এটি বিকাশ লাভ করতে পারে, যেমন টিকা দেওয়া। এটিকে ভ্যাকসিন-প্রবর্তিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বলে।

অভিযোজিত বা অর্জিত অনাক্রম্যতা শরীর থেকে প্যাথোজেন নির্মূল হয়ে যাওয়ার পরেও বজায় থাকে, শরীর যদি আবার ওই প্যাথোজেনের সংস্পর্শে আসে তবে 'মেমরি সেল’ বা স্মৃতি কোষগুলি সেই রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

১) সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা- শরীর যখন কোনও রোগের জীবাণুর সংস্পর্শে আসে তখন সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর হয়; রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই রোগের অ্যান্টিবডিগুলি উৎপাদন করতে শুরু করে। প্রাকৃতিক সংক্রমণ (স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা) বা ভ্যাকসিন (ভ্যাকসিন-প্রবণতা প্রতিরোধ ক্ষমতা) প্রবর্তনের মাধ্যমে যে কেউ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারে। উভয় উপায়েই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভবিষ্যতে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে শনাক্ত করবে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করে এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। সক্রিয় অনাক্রম্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কখনও কখনও তা আজীবন থাকে।

২) নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা- এই প্রকার অনাক্রম্যতা অর্জন করা হয় যখন কোনও ব্যক্তি তার নিজের অনাক্রম্যতার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের পরিবর্তে কোনও নির্দিষ্ট রোগের অ্যান্টিবডি পায়। যেমন-

  • জন্মের আগে প্লাসেন্টার মাধ্যমে এবং জন্মের পরে স্তন্যদুগ্ধ পানের মাধ্যমে শিশু মায়ের শরীর থেকে অ্যান্টিবডি পায়। জীবনের প্রথম কয়েক বছরে এই নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতাই শিশুদের কিছু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
  • যখন নির্দিষ্ট রোগ থেকে তাৎক্ষণিক সুরক্ষার প্রয়োজন তখন ইমিউন গ্লোবইউলিন দেওয়া হয়। একজন ব্যক্তি অ্যান্টিবডিযুক্ত ইমিউন গ্লোবইউলিনের মাধ্যমেও নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা পেতে পারেন।

নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতার প্রধান সুবিধা হল এটি তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়, যেখানে সক্রিয় অনাক্রম্যতা বিকশিত হতে এবং সুরক্ষা দিতে সময় লাগে (সাধারণত বেশ কয়েক সপ্তাহ)। তবে, নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা কেবল কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস স্থায়ী হয়।

গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা (হার্ড ইমিউনিটি) কী?

গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা: এটি ‘জনসংখ্যা অনাক্রম্যতা’ নামেও পরিচিত। গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা হল সংক্রামক রোগ থেকে পরোক্ষ সুরক্ষা। জনগণ যখন কোনও নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে বা টিকা গ্রহণের মাধ্যমে নিজ দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে নেয়, তখন নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। যদি পর্যাপ্ত লোককে টিকা দেওয়া হয় তবে আক্রান্ত ব্যক্তি নতুন কাউকে সংক্রমিত করতে পারে না। সহজেই সংক্রমণ শৃঙ্খল ভেঙে যায়। তাই সংক্রমিত রোগটির পক্ষে যারা টিকাগ্রহণ করতে পারেননি, বা অসুস্থ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল তাঁদের নতুন করে আক্রমণ করা কঠিন হয়ে যায়।

গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা অর্জনের জন্য কত শতাংশ জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা দরকার তা প্রতিটি রোগের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হামের বিরুদ্ধে গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা অর্জন করতে প্রায় ৯৫% লোককে টিকা দেওয়া দরকার,বাকি ৫% তাঁদের দ্বারা সুরক্ষিত হবে যারা টিকাগ্রহণ করেছে।

টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া (অ্যাডভার্স ইভেন্টস ফলোইং ইম্যুনাইজেসন)

টিকাকরণ (এইএফআই) পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া বলতে টিকাদান পরবর্তী অপ্রীতিকর ঘটনাকে বোঝায়। ভ্যাকসিনের ব্যবহারের সঙ্গে এর সাধারণ কার্যকারণ সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসাবে যে কোনও প্রতিকূল বা অনিচ্ছাকৃত উপসর্গ, পরীক্ষাগার থেকে প্রাপ্ত অস্বাভাবিক ফল, লক্ষণ বা রোগ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে (এইএফআই) পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেছেন।

  • টিকার পণ্য সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া- অনেকসময় টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া টিকার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলির এক বা একাধিক কারণে হতে পারে। উদাহরণ- ডিপিটি টিকা দেওয়ার পরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফুলে যেতে পারে।
  • টিকার মানের ত্রুটি-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া- টিকার এক বা একাধিক মানের ত্রুটির কারণে টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। উদাহরণ: নিষ্ক্রিয় পোলিও ভ্যাকসিনের পরে পক্ষাঘাত পোলিও। টিকার অকার্যকরী নিষ্ক্রিয়তার কারণে এটি হয়।
  • টিকাদান ত্রুটি-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া: অনুপযোগী টিকা ব্যবস্থাপনা, নির্দেশ বা পরিচালনার ফলে টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে এবং তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। উদাহরণ: দূষিত ‘মাল্টিডোজ ভায়াল’ দ্বারা সংক্রমণ।
  • টিকাদান নিয়ে উদ্বেগ-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া: টিকাদান সম্পর্কে উদ্বেগ থেকে টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। উদাহরণ: কিশোর বয়সে টিকা নেওয়ার সময়/তার পরবর্তী সময়ে ভ্যাসোভেগাল সিনকোপ।
  • কাকতালীয় ঘটনা: টিকা দেওয়ার পরে কাকতালীয় ঘটনাগুলি হতে পারে তবে তা টিকা বা টিকার কারণে ঘটে না।

* টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ হওয়ার পর, প্রতিক্রিয়াকে মৃদু, গুরুতর এবং তীব্র হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে।

টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মাত্রা মৃদু হলে সাধারণ, স্ব-সীমাবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় যেমন, ব্যথা, ইনজেকশন দেওয়ার জায়গায় ফোলাভাব, জ্বর, জ্বালা, ইত্যাদি।

টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মাত্রা গুরুতর হলেও তা জীবনের ঝুঁকি বা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সৃষ্টি করে না। গুরুতর প্রতিক্রিয়ার উদাহরণগুলির মধ্যে বলা যেতে পারে খুব জ্বর হতে পারে। দেহের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রির বেশি (> ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) হয়ে যায়।

টিকাকরণ পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার তীব্র মাত্রার ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু হতে পারে, রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ফলস্বরূপ পিতামাতা/সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

তথ্যসূত্র-

কোভিড-১৯ টিকাকরণ

ভারত একদিকে রোগ নির্ণয় করার আরও ভাল উপায় এবং চিকিৎসা কৌশলের মাধ্যমে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ টিকার সফল ভূমিকা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রোগের বিস্তার রোধ করে রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও সহায়তা করবে। বিশ্বব্যাপী, নিরাপদ এবং কার্যকর কোভিড-১৯ টিকার জন্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে যেমন:

ভাইরাস ভ্যাকসিন: এই টিকায় ভাইরাসটির দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় রূপ ব্যবহার করা হয়। করোনাভাইরাস বিরুদ্ধে দুই ধরণের ভাইরাস ভ্যাকসিন রয়েছে, দুর্বল ভাইরাস এবং নিষ্ক্রিয় ভাইরাসের ভ্যাকসিন।

ভাইরাল-ভেক্টর ভ্যাকসিন: এই টিকাগুলির বিকাশের ক্ষেত্রে, একটি ভাইরাস (যেমন অ্যাডেনোভাইরাস বা হাম) ভেক্টর বা বাহক হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং জিনগতভাবে শরীরে করোনভাইরাস প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে, যা প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিকাশের অধীনে দুই ধরণের ভাইরাল-ভেক্টর ভ্যাকসিন আছে, সেগুলি হল ‘রেপ্লিকেটিং ভাইরাল ভেক্টর’ (কোষের মধ্যে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে) এবং ‘নন-রেপ্লিকেটিং ভাইরাল ভেক্টর’ (কোষের মধ্যে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না)।

নিউক্লিক অ্যাসিড ভ্যাকসিন: নিউক্লিক অ্যাসিড টিকাগুলি রোগ প্রতিরোধকারী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার (জীবাণু) জিনগত উপাদানগুলি ব্যবহার করে, যা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। জেনেটিক উপাদান ডিএনএ বা আরএনএ হতে পারে।

প্রোটিন সাবইউনিট ভ্যাকসিন: প্রোটিন সাবইউনিট টিকাগুলি রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস থেকে প্রোটিনের উপাদান ব্যবহার করে রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি করে। করোনভাইরাস বিরুদ্ধে দুটি প্রোটিন ভিত্তিক টিকা তৈরি করা হচ্ছে, সেগুলি হল প্রোটিন সাবইউনিট টিকা এবং ভাইরাসের মতো উপাদান টিকা (ভাইরাস-লাইক পার্টিকল ভ্যাকসিন)।

ভারতে টিকাকরণের জন্য কোভিশিল্ড এবং কোভাক্সিন- এই দুই ধরণের টিকা চালু করা হয়েছে। কোভিশিল্ড ভাইরাল ভেক্টর প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অপরদিকে কোভাক্সিন হল সম্পূর্ণ ভিরিওন নিষ্ক্রিয় করোনাভাইরাস টিকা (হোল ভিরিয়ন ইনঅ্যাক্টিভেটেড করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন)। চার সপ্তাহের ব্যবধানে টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়।

গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা অর্জন করতে কত শতাংশ জনগণকে কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে টিকা দিতে হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি জনসংখ্যা, টিকা, টিকা দেওয়ার জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক এবং অন্যান্য কারণ অনুযায়ী পৃথক হবে।

নিরাপদ এবং কার্যকর টিকার সাহায্যে গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা অর্জন করতে পারলে তা রোগটিকেই বিরল করে তোলে এবং মানুষের জীবন রক্ষা করে।

ভারতে কোভিড-১৯ টিকাকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে-

Audio visual on Dr Guleria, Director AIIMS, Delhi sharing FAQs on COVID-19 Vaccine rollout

Frequently Asked Questions on COVID-19 Vaccine

COVID-19 Vaccine Communication Strategy https://www.mohfw.gov.in/pdf/Covid19CommunicationStrategy2020.pdf

COVID-19 Vaccines Operational Guidelines Updated as on 28 December 2020

তথ্যসূত্র-    

https://www.mohfw.gov.in/-+pdf/COVID19VaccineOG111Chapter16.pdf

https://www.mohfw.gov.in/pdf/LetterfromAddlSecyMoHFWregContraindicationsandFactsheetforCOVID19vaccines.PDF

  • PUBLISHED DATE : Mar 15, 2021
  • PUBLISHED BY : NHP Admin
  • CREATED / VALIDATED BY: NHP Admin
  • LAST UPDATED ON : Mar 15, 2021

Discussion

Write your comments

This question is for preventing automated spam submissions