ডায়রিয়া

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সারাদিনে তিনবার বা তার বেশীবার পাতলা  বা তরল মলের নির্গমন হলে তাকে ডায়রিয়া বলা হয়। বেশীবার  মলের আকারে নির্গমনকে ডায়রিয়া বলা যায় না, বা স্তন্যপানকারী শিশুর পাতলা ও কাদাটে  আকারের মল নির্গমনকে ডায়রিয়া বলা যায় না।

এটি সাধারণত: গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সংক্রমণের লক্ষণ যা নানা ধরণের ভাইরাস, পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটে থাকে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন  অনুযায়ী ডায়রিয়া ঘটিত রোগের ফলে প্রতি বছর ৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে প্রায় ১.৩ লক্ষ শিশু-মৃত্যু ঘটে এবং যার ফলে এটিকে বিশ্ব ব্যাপী শিশু-মৃত্যুর দ্বিতীয় সাধারণ কারণ হিসেবে ধরা হয়। মাত্র পাঁচটি দেশেই  পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশী শিশু-মৃত্যু ঘটে এবং এই দেশগুলো হল ভারতবর্ষ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়া।

তবে, ডায়রিয়ার চিকিৎসা রয়েছে ও ডায়রিয়াকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। গুরুতর ডায়রিয়ার ফলে শরীরে তরলের পরিমাণ কমে যায় এবং বিশেষ করে ছোট্টো শিশু এবং অপুষ্টি ও অনাক্রম্যতার সমস্যায় যারা ভুগছে তাদের সবার কাছে ডায়রিয়া মারাত্মক হতে পারে। দূষিত পানীয় জল ও খাবার  বা মনুষ থেকে মানুষে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এই সংক্রমণ ছড়ায়।

তথ্যসূত্র : www.nhs.uk 
www.unicef.org 
www.nlm.nih.gov 
digestive.niddk.nih.gov 
www.who.int 
Diarrhea in India:   www.youtube.com 

ডায়রিয়ার উপসর্গগুলো 'কারণ' ও 'কে আক্রান্ত হয়েছে ' তার উপর নির্ভর করছে।

উপসর্গগুলো হল :

  • তরল মল
  • পেটের যন্ত্রণা
  • ঘনঘন মল ত্যাগ
  • পেটের মোচড় দিয়ে মল ত্যাগের তাড়না
  • বমিবমি ভাব বা বমি করা

উপরে দেওয়া উপসর্গগুলো ছাড়াও জটিল ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে যেসব উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হল :

  • তীব্র ডায়রিয়ার কারণে শরীরে জলের ঘাটতি
  • রক্ত, শ্লেষ্ম বা অজীর্ণ খাদ্য মলে দেখতে পাওয়া
  • শরীরের ওজন কমে যাওয়া
  • জ্বর

তথ্যসূত্র : www.nhs.uk

ডায়রিয়া তখনই ঘটে যখন মলের উপাদান থেকে তরল শোষিত হয় না বা অতিরিক্ত তরল যখন মলের মধ্যে নি:সৃত হয়।

স্বল্পমেয়াদী ডায়রিয়া : ডায়রিয়া সাধারণত গ্যাস্ট্রোএন্টারিটিসের (এক প্রকার পেটের সংক্রমণ) উপসর্গ।  এর কারণগুলো হল :

  • নোরো ভাইরাস বা রোটা ভাইরাসের মত এক প্রকার ভাইরাস
  • জিয়ার্ডিয়া ইনস্টেনটেনালিসের মত এক প্রকার পরজীবী
  • ক্যাম্পিলোব্যাকটর, ক্লসট্রিডিয়াম ডিকিসাইল, ইস্টেরিয়া কোলাই সালমোনেলা ও সিজেলার মত ব্যাকটেরিয়া যা খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন হয়।

স্বল্পমেয়াদী ডায়রিয়ার অন্যান্য কারণগুলো হল :

  • দু:শ্চিন্তা বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া
  • বেশী মাত্রায় কফি বা মদ্য পান
  • কোনো খাবারে এলার্জি
  • এপেন্ডিসাইটিস 
  • রেডিও থেরাপীর ফলে অন্ত্রের  আস্তরণের ক্ষতি হলে

 

ডায়রিয়া মাঝে মধ্যে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে হতে পারে, যেমন-

  • এন্টিবায়োটিকস
  • অম্লনাশক ওষুধ যেগুলোতে ম্যাগনেশিয়াম থাকে।
  • কেমোথেরাপিতে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ
  • স্টেরয়েডহীন কিছু অপ্রদাহী ওষুধ
  • কিছু বাছাই করা সেরোটোনিন ইনহিবিটার্স (এস এস আর আই এস)
  • স্ট্যানিন - কোলে স্টেরল কম করার ওষুধ
  • ল্যাক্সাটিভ- কোষ্ঠবদ্ধতায় যে সকল ওষুধ পেট পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।

দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া :

  • অন্ত্রের ক্যান্সার - এর ফলে ডায়রিয়া হয় ও মলে রক্ত নির্গত হয়।
  • ক্রনিক প্যানক্রিয়াটিস - অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ। অগ্ন্যাশয় নামক  ছোট অঙ্গটি থেকে হারমোন ও পাচনকারী তরল উৎপন্ন হয়।
  • কোলিক  রোগ- অন্ত্রের  নালীতে গড়বড় হওয়া।  কেউ যখন গ্লুটেন প্রোটিন সহ্য করতে পারে না তখন এটি হয়।
  • ক্রোন রোগ- এর ফলে অন্ত্রের  নালীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
  • ইরিটেবল বয়েল সিন্ড্রম (আই বি এস)-এর কারণ এখনও পর্যন্ত বোঝা যায়নি।
  • আনুবীক্ষনিক কোলাইটিস-এর ফলে জলীয় ডায়রিয়া দেখা দেয়।
  • আলসারযুক্ত কোলাইটিস- এর ফলে কোলোন (বৃহদন্ত্র) আক্রান্ত হয়।
  • সিস্টযুক্ত ফাইব্রোসিস- এটি বংশগতভাবে পাওয়া একটি অবস্থা, যার ফলে ফুসফুস ও পাচনতন্ত্র আক্রান্ত হয়।
  • অন্ত্রে অস্ত্রোপচারের পর কিছু ক্ষেত্রে তীব্র ডায়রিয়া হতে পারে।

ডায়রিয়া কিছু ক্ষেত্রে বেরিয়াট্রিক সার্জারির (ওজন কমানোর জন্য এক প্রকার সার্জারী) কারণেও  ঘটে থাকে।

 

যেসব ক্ষেত্রে আরো বেশী করে তদন্ত করা উচিত :

  • শিশুর ক্ষেত্রে
  • ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাঝারি বা ক্ষতিকর ডায়রিয়া
  • মলে রক্ত দেখা দিলে
  • মোচড় দিয়ে পেট ব্যথা না হওয়া, জ্বর আসা, ওজন হ্রাস
  • ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে  
  • খাদ্য প্রস্তুত করেন যাঁরা তাঁদের ক্ষেত্রে , কারণ এদের থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ হয়
  • হাসপাতাল, শিশু তত্ত্বাবধান কেন্দ্র বা বৃদ্ধাশ্রম

মলের  নমূনা  : সংক্রমণের কারণ জানার জন্য মলের নমূনা নেওয়া হয়।

রক্ত পরীক্ষা :  রক্ত পরীক্ষা সাধারণত করা হয় প্রদাহের কারণ পরীক্ষা করার জন্য। যদি এর পরও ডায়রিয়ার কারণ পরিষ্কার না হয় তবে যেসব পরীক্ষাগুলোর পরামর্শ দেওয়া হয় সেগুলো হল:

  • সিগময়ডোস্কোপি- এক্ষেত্রে সিগময়ডোস্কোপ যন্ত্রটিকে (একটি পাতলা নমনীয় নল যার সঙ্গে একটি ছোট ক্যামেরা ও নলের প্রান্তে একটি আলো  লাগানো থাকে) মলাশয়ের মধ্যে প্রবেশ করানো হয় এবং সিগময়ে কোলোনের মধ্যে দিয়ে কোলোনের 's ' (এস) আকৃতির শেষ পর্যন্ত ঢোকানো হয়।
  • কোলোনোস্কোপি : একই রকম পদ্ধতিতে একটি বড় নল থাকে যাকে কোলোনোস্কোপ বলে। এটি বৃহদন্ত্র বা কোলোন পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

তথ্যসূত্র : www.nhs.uk

তরল পান করা: শরীরের শুকিয়ে যাওয়া (নিরুদন) এড়াতে  প্রচুর পরিমাণে তরল পান করা উচিত।

ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ও আর এস) : নিরুদন প্রতিরোধ করতে ও.আর.এস ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে, উচ্চ মাণের ঘরোয়া সমাধানের মধ্যে পড়ে - লবণযুক্ত ভাতের ফ্যান, লবণাক্ত লস্যি, লবণযুক্ত সব্জি ও লবণযুক্ত মুরগির স্যুপ।

ওষুধ : কিছু মারাত্মক ধরণের ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে সুফল পাওয়া যায়, তবে নির্দিষ্ট কতগুলো অবস্থা ছাড়া এগুলো ব্যবহার করা ঠিক নয়। কাউন্টার ড্রাগ পেপ্টো বিসমল (বিসমাথ সাবস্যালিসাইলেট), ক্ষিপ্রতা-বিরোধী ওষুধ ইমোডিয়াম প্লাস (সাইমেথিকোনের সঙ্গে লোপামাইড হাইড্রোক্লোরাইড) জাতীয় ওষুধ ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

খাদ্যাভ্যাস : একজন ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে খাবার খাওয়ানো চালিয়ে যেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দেয়। খাবার খাওয়ানো চালিয়ে গেলে অন্ত্রের স্বভাভাবিক কাজে ফেরা দ্রুত হয়। বিপরীতভাবে যেসব বাচ্চার খাদ্য সীমিত করে দেওয়া হয় তাদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে।

তথ্যসূত্র :  www.nhs.uk 

www.icmr.nic.in

ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত :

  • খাবার খাওয়ার বা তৈরির আগে এবং শৌচালয় থেকে ফিরে ভালো করে হাত পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। 
  • হাতল ও বসার জায়গাসহ পুরো শৌচালয় ভালো করে পরিষ্কার রাখুন। শৌচালয়ে সংক্রমণনাশী তরল ছড়িয়ে রাখুন।
  • বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তোয়ালে, চামচ ও বাসনপত্র ভাগাভাগি করবেন না।
  • ডায়রিয়া ভালো হওয়ার ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজে বা স্কুলে যাওয়া বন্ধ রাখুন।

তথ্যসূত্রwww.nhs.uk 

digestive.niddk.nih.gov 

 

  • PUBLISHED DATE : Oct 10, 2015
  • PUBLISHED BY : NHP CC DC
  • CREATED / VALIDATED BY : NHP Admin
  • LAST UPDATED ON : Oct 10, 2015

Discussion

Write your comments

This question is for preventing automated spam submissions
The content on this page has been supervised by the Nodal Officer, Project Director and Assistant Director (Medical) of Centre for Health Informatics. Relevant references are cited on each page.